১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মালী

কাজের গুঁতোয় আমাকে খুব ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠতে হয়। বডি ক্লক ব্যাটা ছুটির দিনেও ঘুম থেকে তুলে দেয়! সেসব দিনে, লক্ষ্য করে দেখেছি খুব ভোরে কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়েন,  ফুল তুলতে।  


গাছের মুন্ডু ধরে নামিয়ে পটাপট ফুল ছেঁড়েন - টগর কলকে শিউলি জবা অপরাজিতা.. .। নামগুলো আসলে সব আমাদের দেশের মেয়েদেরই ডাকনাম বা ভালোনাম৷ সে কথাটা তাঁদের মনে থাকে কি না জানি না। ব্যালকনি থেকে দেখছি দেখলে, বিব্রত হন! আমি চোখ ফিরিয়ে নিই। বয়স্ক মানুষগুলির নিরামিষ বিশ্বাসে আঘাত করার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। 

আজ একজনকে দেখি রেনকোট গায়ে, তার ওপরে ছাতা মাথায় হাতে লগি নিয়ে ফুল তুলতে বেরিয়ে পড়েছেন! মানে, প্যাশন' কী শক্তিশালী অনুভূতি, ভেবে দেখুন! ওইসব ফুল পটাপট তুলে, গোপাল' কী কালিঠাকুর, কী লক্ষীর পট, কী শিবলিঙ্গ,  ফোটোতে সাজিয়ে, তাঁরা আনন্দ পান! আনন্দ পান, আমার কাছে অবশ্য সেটাই বড় কথা। তাঁদের আর কারোকে কিছু প্রমাণ করার নেই৷ অনেক করেছেন। ব্যস!

কিন্ত যারা আগামী দিনের? তাঁরা নতুন যুগের মানুষ।  তাঁরা ভেবে দেখবেন, গাছ একটা জ্যান্ত জিনিস। সে ফুল ফোটায় তার নিজের ধান্ধায়।  অযৌন জনন-পুংকেশর-গর্ভকেশর, সেসব ভুলে মেরে দিয়ে, পটাপট ফুল ছেঁড়ে লোকজন! স্কুলে পড়া লাইফ সায়েন্স, মনে আছে? না,  কবেই ভুলে মেরে দিয়েছ! বইটাও কবে যেন কাকে দিয়ে দিয়েছ! নীচের ক্লাসের ভাই বা বোন'কে!? 

গোপাল, তুমি দেখো! শেষমেশ!...ভিশাস সার্কল!

কেউ কেউ জ্যাভলিন নিয়ে দৌড়ে আসবেন - গাঁথতে..

 মশায়  আপনি কিচ্ছু জানেন না!

-  সকাল বেলায় জগন্নাথ ঘাটের ফুলের বাজার দেখেছেন? 

-  দুর্গাপুজোর সময় পদ্ম, সরস্বতীপুজোর সময় গাঁদা, শিবরাত্রির সময়ে আকন্দ' ফুলের দাম আলাদা হয়!  জানেন, ধারণা আচে?

- গোলপার্কের ফুলের দোকানগুলোতে পা দিয়েছেন কখনও? কোনওদিন একটা গোলাপ কিনেছেন? বা দুই আঁটি রজনীগন্ধার স্টিক!? কিনেছেন?

- ক্ষীরাইয়ে রেললাইনের ধারে ফুলের ক্ষেত দেখেছেন কোনওদিন? ছবি তুলেছেন?

- ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারস ' বেড়াতে গিয়েছেন কোনওদিন? উত্তরাখণ্ড বা সিঙ্গালিলা,  যেটাই হোক..দেখেছেন?

- সিলসিলা'তে অমিতাভ আর রেখা'কে দেখেছেন, 'দেখা এক খোয়াব তুনে...' নিজচক্ষে কোনও দিন দেখেছেন কাশ্মীরের টিউলিপ ফুলে ভরা ক্ষেত? 

- নিদেনপক্ষে আলিপুরের হর্টিকালচারের বাগানে? পা দিয়েছেন?

পাঁচে পঞ্চবাণ! মা শিখিয়েছিল। আমি নতমস্তকে মেনে নেব এর কোনওটাই আমার সিভি'তে এখনো নেই। এত বছর এ দুনিয়ায় থেকেও এখনো কিছুই দেখা হয় নি!

আমি শুধু জোড়া জুঁইফুলদের ফুটে উঠে থাকতে দেখেছিলাম। তাদের সুগন্ধ পেয়েছিলাম কয়েক মূহুর্ত। তারা তো ছিল, ব্যালকনির রেলিংয়ে ঝোলানো টব মাত্র। সময় ফুরোলে নিজের নিয়মে ঝরে পথে গিয়ে পড়েছে। এইখানে মান্না দে ধরে ফেলেন, ' আমি / তার ঠিকানা রাখিনি/ছবিও আঁকিনি/ কোথা সে জানি না...

আমরা নতুন যুগের বয়স্ক, বৃদ্ধ মানুষ!  আমরা জানব, স্মৃতি মানে শুধু বোঝা নয়, আমাদের 'প্লেলিস্ট'এর আয়তনও বাড়ে !



০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মূর্তি

মেঘটা জমতে জমতে, আসছে। পাহাড়ের দিক থেকে।

এখন নদীর জল কিছু অন্যরকম চঞ্চল!  ঠান্ডা হাওয়াটা আগে আগে ছুটে আসছে, জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে, খবর দিতে দিতে...বৃষ্টি আসছে...।

লোকটা কিছুক্ষণ আগেই এসেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে, মেঘ মেপেছে। লুঙ্গিটা কষি দিয়ে বেঁধেছে হাঁটুর ওপরে। হাঁটুজলে নেমেছে। হাত ঘুরিয়ে জাল পেতেছে জলের গায়ে।

লোকটা শিকারী।

ও জানে, 

হাওয়ায় হাওয়ায় খবর গেছে জলের তলায়, খলবলে বৃষ্টি উৎসব হবে। জল নামবে পাহাড় থেকে। 

নদীর ওপারে চাপড়ামারির জঙ্গল, সেখানের গাছগুলোর সে কী আনন্দ, কী হইহই! 

যেন গ্যালারিতে জিততে থাকা দলের দর্শক

একটা শুকনো গোলাটে পাথরের ওপর বসে মাছ ধরা দেখছিলাম। 

জালে টান পড়ল। জল থেকে উঠে আসছে। লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে, দাঁত বের করে হাসল। রূপোলী চকচকে হাসিটা,  ওর হাতের জাল'টার গা থেকে, এখন লোকটার চোখে মুখে!

বিদ্যুৎ চমকাল। ডুয়ার্সে বৃষ্টি আসছে। এ বৃষ্টি, চরিত্রে কিছু বুনো। আনন্দের প্রকাশ'ও ঠিক সমতলের মত ভব্যসব্য, জল জমানো নয়।  হুট করে এসে পড়ে। আলাপ থেকে সটান ঝালা! 

ট্যুরিস্ট লজে ফেরাই ভালো...



২৯ জুন ২০২২

কলকাতা

 #কলকাতা_২০০০

এখানে শুধু কেজো লোকেরাই আসেন। কেবলমাত্র কাজের জন্যে, প্রয়োজনের জন্যে, এখান দিয়ে যাতায়াত করেন। এখানে এক এক রকম জিনিসের জন্য এক একটা পাড়া। একই ধরনের জিনিসের দোকান সারি সারি। হোলসেল আর রিটেল মার্কেট। ধরুণ ইলেকট্রিকের সরঞ্জাম যদি খোঁজেন তবে আপনি যাবেন এজরা স্ট্রিটে। ইলেকট্রনিক্সের জিনিস চাইলে চাঁদনি। অটোমোবাইল সংক্রান্ত কাজে যাবেন মল্লিকবাজার বা ওয়েলিংটনে। আবার ধরুন, জন্মনিয়ন্ত্রণ -সংক্রান্ত জিনিসপত্রের প্রয়োজনে আপনি যাবেন মতি শীল স্ট্রিট নামের রাস্তাটায়। সেটার আরেকটা নাম ছিল 'ফ্যামিলি প্ল্যানিং স্ট্রিট। চশমা-সংক্রান্ত প্রয়োজনে আপনার গন্তব্য হবে বৌবাজার স্ট্রিট বরাবর চশমার দোকানগুলো। আর ঘড়ির ব্যাপারে আপনি যাবেন রাধাবাজারে। লোহার কাজের জন্য আপনি খোঁজ করবেন নির্মলচন্দ্র স্ট্রীটের দোকানগুলোতে বা চালতাবাগান লোহাপট্টিতে। এবং অদ্বিতীয় কলেজ স্ট্রীট। এর পশরা বিচিত্র। প্রথমে বৌবাজার শিবমন্দিরের গলি। সেখানে সাকী ও সুরা ও আনুষঙ্গিক নেশার আয়োজনের খবর রসিকজনে রাখেন। সে তল্লাট পার হলে, আপনি পাবেন বাথরুম-টয়লেট সংক্রান্ত দোকানের সারি। তারপর ডাক্তারি অস্ত্রশস্ত্র - সার্জিকাল ইন্সট্রুমেন্টস-বায়োলজি বক্স ইত্যাদির মহল্লা। তারপর বইপাড়া। আর বৌবাজার থেকে শিয়ালদার দিকে যেতে রাস্তার দুদিকে ঝলমলে আলোজ্বলা সাইনবোর্ড - গয়নার দোকান সারবাঁধা। শিয়ালদা বৈঠকখানা বাজারের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তাটার দু'পাশে সারি সারি মশলার দোকান। সূর্য সেন স্ট্রিটের পাড়াটা কাগজের- নানারকম কাগজ-বিয়েরকার্ড -ইত্যাদির দোকান। 

 আমাদের শহরে এমনই,  যাকে বলে একই জাতের এলাকা আছে, আরও যা মনে পড়ছে তা হল - গঙ্গার ধারে মল্লিক ঘাটে ফুলের বাজার। গ্যালিফ স্ট্রীটের পশুপাখির বাজার। মৃৎশিল্পীদের স্টুডিওপাড়া -  কুমারটুলি ইত্যাদি। আমার না-জানার দরুণ আরও কিছু নাম ছেড়ে গেলে আপনারা অ্যাড করে দেবেন 🙏

জায়গাগুলোর হদিশ না জানলে, গুগল ম্যাপেই দিব্যি পেয়ে যাবেন,

তবে এদের মধ্যে সেরা সিরিজটি আছে এলগিন রোডের ধারেকাছেটায়।  'লক্ষ্মীবাবুকা সোনা-চাঁদি কি দুকান'..। 'আসলি' শব্দটি সাইনবোর্ডগুলিতে আলাদা জায়গা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এদের মধ্যে কোনটা যে আসলে 'আসলি তা আমি এ শহরে এতদিন থেকেও জানতে পারি নি। 

সঙ্গের ছবিটা মেট্রোগলির। এ রাস্তার বিশেষত্ব হল বেশিরভাগ দোকান, ক্যামেরা-সংক্রান্ত জিনিসের




২৮ জুন ২০২২

মরশুমি দেবীর গপ্পো

 #জোলো_গপ্পো

মরশুমি দেবী ভীষণ রকমের পাড়াবেড়ানে মানুষ। সকালবেলার রোদ্দুর মেখে নাইটির ওপরে একটা ওড়না চাপিয়ে বেরিয়ে পড়েন, পাড়া বেড়াতে। পাড়ার লোকের হাঁড়িতে হাঁড়িতে উঁকি দিয়ে দেখেন কোনো খবর আছে কি না। কলতলার ঝগড়ায় অংশ নেন সাধ্যমত। তাতে গলা সাধা, ব্যাকরণ চর্চা আর মুখ-ছোটানো-কবাডি প্র‍্যাকটিস তিনটেই নিয়মিত হয়ে যায়। পাড়ার পুরনো বাসিন্দা মরশুমি দেবী এ খেলায় একজন পাকা খেলোয়াড়। ঈষৎ ভাঙা কন্ঠস্বরটি আর বাছাই করা শব্দাবলী প্রয়োগের তেজে কেউ ওনার সামনে বেশিক্ষণ টিঁকতে পারে না। কাঁসার বাসনের ঝনঝন ঝঙ্কারে সারা পাড়া বাজতে থাকে। 

মরশুমি দেবীর বর সিজনবাবু তাঁর লজঝড়ে লাল রঙের বাইকে, মাথায় নীল রঙের হেলমেট চাপিয়ে,অপিস যান। তাঁদের ইস্কুল-পড়ুয়া মেয়ের নাম সেয়ানা। পড়াশোনা ছাড়াও খুবই ব্যস্ত সে। হোম-সায়েন্সের টিউশনে যায়। একটু বেলার দিকে, মরশুমি দেবী বর'কে অপিসে রওনা করিয়ে, মেয়েকে টিউশনে পৌঁছে দিয়ে, কোমরের আঁচলে গোঁজা কাঠি আর হাতে মই নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। পড়শিদের পাকা ধানের ক্ষেতের দিকে।

এহেন মরশুমি দেবী অনেকগুলো গাছ পোষেন। পশুপাখিদের নিয়মিত খেতে দেন। ডোবার জলের মাছ থেকে মাটিতে কুকুর-বেড়াল থেকে আকাশের কাক-পায়রাগুলো আর পাড়ার পাগলছাগল - নিয়মিত তাঁর কাছে আসে, খেতে। মরশুমি দেবী তাদের সক্কলকে যত্ন করে বসিয়ে খাওয়ান।  গাছেদের পায়ের কাছে সার-জল ঢেলে দেন। গাছেরা ওঁকে দেখলে খুশিতে মাথা নাড়ে। কুকুরদের জন্য আছে আলাদা আলাদা পাত্র। তাতে, তাদের জন্যে পড়ে ভাত-তরকারি । কুকুর-বেড়াল'রা ওঁকে দেখলে খুশিতে ল্যাজ নাড়ে। সবাই শান্তভাবে সারি দিয়ে নিজের নিজের খাবার খায়। মরশুমি দেবী ওঁদের সঙ্গে আদুরে গলায় গল্প করেন। দোয়েল-কোয়েলের কুহু-কলতানে পাড়া ভরে ওঠে।

তাদের খেতে দেওয়ার সময় দৃশ্যতই খুব তৃপ্তি পান মরশুমি দেবী। ওনার মুখখানায়, ঝকঝকে করে মাজা কাঁসার বাসনের রঙ ধরে। 

এ'সব সময়ে, বুঝে উঠতে পারি না, মরশুমি দেবী আসলে, একজন খারাপ মানুষ না কি ভালো মানুষ!



২৭ জুন ২০২২

কাছেপিঠে -বেড়ানো১

 শহর থেকে বেশি দূরেও নয়। যে'কোন একটা অলস দিনে। জলের ধারে কয়েক মিনিট। ঘাটের কাছে গল্প বলে নদীর জল - তাই এখানে অন্তত কিছু মূহুর্ত, মানুষের কোনও কথা থাকেনা। সেলফি তোলে একলা সাইকেল। যেন সিনেমার একটা ফ্রেম। এখুনি টাইটল-কার্ডে নাম ভেসে উঠবে! প্রতিদিনের কাজের মধ্যে থেকে ছুটি পেলে মাঝে মাঝে যেতে চাই এমন জায়গায়। আমাদের চেনা পৃথিবীর মধ্যেই, এই ট্রিপ'গুলোর জন্য ইচ্ছে-ডানাই যথেষ্ট। সাধ্যের ব্যাকপ্যাকটা বিশেষ ভারী হয় না।

ছবিটা চন্দননগরে তোলা।


জুন'২০২১



১৬ জুন ২০২২

লাভা

 সাতসকালে বেরিয়ে পড়েছি। মেঘে-কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে থম মেরে আছে পাইন আর বার্চ-পরা পাহাড়। জীপস্ট্যান্ড। ঠান্ডায় উবু হয়ে গোল হয়ে বসে কথাবার্তা কইছে কয়েকজন। একজন খুব যত্ন করে কাপড় দিয়ে গাড়ি মুছছে। এখান থেকে মনাস্ট্রিটা পায়ে হেঁটে কয়েকশো গজ। রাস্তাটা ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে। বাজার। চায়ের দোকান। উনুনে বসানো গরম সসপ্যানের ওপর বাচ্চা বাচ্চা মেঘ। পায়ের কাছে বসে উমরো ঝুমরো কুকুর। চা-বিস্কুট শেষ করে আবার হিড়হিড় করে হাঁটা। মনাস্ট্রি। এক পাক ঘুরে আসতে আসতে সুয্যি উঁকি দিল পাহাড়ের ওপর দিয়ে। শুরু হয়ে গেল ঝকঝকে একটা দিন। লাভা'য়।



১৩ জুন ২০২২

মনের_বাক্স

সেবক পেরিয়ে যে ন্যাশনাল হাইওয়েটা তিস্তা নদী বরাবর পাহাড়ের গা দিয়ে কালিম্পং -গ্যাংটকের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তাটায় বিরিক এলেই, পাহাড়ের গায়ে হঠাৎ করে একটা রাস্তা উঠে গেছে একেবারে প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি কোণ করে, লাতপাঞ্চার-সিটং এর দিকে, ঠিক সেই মোড়টায় একটা ফুলের দোকান। সেটাই এ তল্লাটের ল্যাণ্ডমার্ক - অনেকেই জানেন। গত নভেম্বরে মংপু থেকে অহলদাড়া হয়ে ফেরার সময়,সেখানটায় গাড়ি থামিয়ে সংগ্রহ করা গেছিল এ'কে, সঙ্গে যার ছবিটি দিয়েছি। ছোট্ট টবে, ততোধিক ছোট্ট গাছটি - ফুলের নাম Azalea. এক ধরণের রডোডেনড্রন। সংশয় ছিল পাহাড়ের গাছ, গঙ্গার এপারে এসে বাঁচবে কি না! কলকাতা অবধি ষোল ঘন্টার জার্নি, লং ড্রাইভ - গাড়ির ডিকিতে লাগেজ আর পেছনের সীটে গাছের টব। 

আজ ছ'মাস পরে, শহর জুড়ে একলা থাকার দিনে, আমাদের সেই গাছে প্রথম ফুল ধরেছে। 'সুতোবাঁধা যত লাল আর সাদা / ওরাই আমার থতমত এই শহরের' - না, গানের পংক্তি নয়, সত্যিকারের রডোডেনড্রন 

- তোমায় দিলাম আজ

জুন'২০২০



১২ জুন ২০২২

বল্লাল ঢিপি

 বল্লাল ঢিপি - 

কৃষ্ণনগর শহরকে ডানদিকে রেখে, জলঙ্গী নদীর ব্রিজ পেরিয়ে, ধুলো ওড়ানো এন-এইচ থার্টিফোর বরাবর বহরমপুর যেতে যেতে বাঁদিক ঘুরে রেললাইন- লেভেল ক্রসিং পার হয়ে যে রাস্তাটা মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরের দিকে গেছে সেটা ধরে খানিকটা এগোলে বামনপুকুর বাজার। ডানদিকে গলি পথ ধরে অল্প এগোলেই একটা পার্কের মত। সেটাই বল্লাল ঢিপি। বড়রাস্তা থেকে টোটো যায়। রিকশা যায়। আমরা গেছিলাম দু'চাকায়। কলকাতা থেকে দূরত্ব দেড়শো কিলোমিটারের একটু কম। 

দেখার কি আছে!  বললে কিছুই নেই, আবার অনেক কিছুই! একটা প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসস্তূপ।  কোনোকালে কোনও হিন্দুমন্দির বা বৌদ্ধবিহার ছিল। ছোট আকারের পোড়ামাটির ইঁটের চওড়া দেওয়াল। ইঁটের কৌণিক সজ্জা। এর বয়স নাকি অন্তত আটশো থেকে ন'শো বছর! সে'আমলে এখানে সেনবংশের রাজত্ব ছিল। রাজা বল্লালসেনের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরী এই স্থাপত্য বলে অনুমান। তাই নাম বল্লালঢিপি। ঢিপি খুঁড়ে বের করার সময় কিছু মূর্তি আর তামার আর লোহার কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেছিল। সেগুলো নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছে কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামে।  

'আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া' থেকে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শেষ করে এখন শুধু সংরক্ষণ করা হয়। রেলিং দিয়ে ঘেরা, তাই পার্কের মতই দেখতে লাগে। টিকিটের কোনও ব্যাপার নেই, প্রবেশ অবাধ। 

আর্কিটেকচার অথবা আর্কিওলজি'রও ছাত্র নই। শুধুই পুরনো ইতিহাসে আগ্রহী। তাই যাবতীয় তথ্যই উইকি, গুগল অথবা গেট দিয়ে ঢুকেই 'আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটি'র বসানো বোর্ডটা থেকেই পাওয়া।

এত পুরনো! এত শ'বছরের রোদ-ঝড়-জল সয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভাবলেও অবাক লাগে! শীতের দিন ফুরনো বিকেলে চুপ করে দাঁড়াই দুটো মিনিট। ইতিহাস ছুঁয়ে।

ডিসেম্বর ২০২১




১০ জুন ২০২২

গাদিয়াড়া

 দেখতে দেখতে বেশ অনেক দিনই হয়ে গেল। কেউ আসে না দেখতে। আগে সপ্তাহ শেষে তা'ও কলকাতা থেকে বিশ্রাম খুঁজতে আসা মানুষের কিছু সমাগম হত। এখন শুধু নাকমুখ ঢেকে রাখা অন্ধকার দিনে আর কেউ আসে না এখানে। পৃথিবীটা আচমকাই বদলে গেছে। কবে আবার আগের মত হবে কেউ জানে না।


আমরাও এখানে এসেছি - মাস্ক পরে আর স্যানিটাইজার পকেটে নিয়ে। ছ'কম একশ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে ডে ট্রিপ-এ। স্কুটি'তে। রূপনারায়ণ নদী এসে হুগলি' তে মিশেছে এখানে - কনফ্লুয়েন্স। তার পর দুজনে মিলে চলে যাচ্ছে কলকাতায়। জলের কী কোনও রং হয়? না কি আলাদা করে কোন নাম হয়? শুধু দিগন্তের ছবির মত সবুজে লেখা থাকে নাম - শীতকালে পিকনিক স্পট বলে যাদের 'ওয়ান ডে ম্যাচ'এর খ্যাতি আছে - ওই'দিকে নূরপুর, ওই'দিকে গেঁওখালি আর এইদিকে, আমরা যেখানে আছি - গাদিয়াড়া। 


এবারের শীতে কী হবে কে জানে! আপাতত বর্ষায় আকাশের রং স্লেট পাথরের মত। জনহীন ট্যুরিস্ট লজের খোলনলচে বদলানোর কাজ চলছে। চলন্তিকা হোটেলে দুপুরের লাঞ্চটা মন্দ নয়। বাকি সব দোকানপাট সারি সারি ঝাঁপ ফেলা। নদীর জলে বাচ্চা বাচ্চা ঢেউ - এখন থেকেই সমুদ্র হওয়ার চেষ্টা - যেন 'হয়েছি যে বাবা'র মত বড়ো'। নদীর ধারে বৃষ্টিভিজে একলা বেঞ্চ - কবে যে আবার সব ঠিক হবে! উলুবেড়ের পরে বম্বে রোড থেকে বাঁয়ে ঘুরে চল্লিশ কিলোমিটার। রাস্তা ভীষণ ভাল। 

এই জার্নিটুকু মন ভাল করা..


অগাস্ট'২০২০




০৭ জুন ২০২২

কৈখালি ২০২০

 কৈখালিতে উইক এন্ড - 


প্রকৃত প্রস্তাবে অফবিট জায়গা। পার্কিং প্লেস গড়ে ওঠার দরকার পড়ে নি এখনো। জয়নগর থেকে ত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা, অবস্থা সাপেক্ষে ঘন্টা খানেক লাগবে যেতে। নদীবাঁধ অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে রাস্তা। শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের ক্যাম্পাসটি সুন্দর। নদীবাঁধের গায়েই কৈখালি পর্যটক আবাস। মাতলা এখানে ক্যানিং এ দেখা শীর্ণা বালিকা নয়, দু'কুল দেখা যায় না তেমন পূর্ণ এক নদী। মজবুত নদীবাঁধটি দিয়ে শান্ত রাখা হয়েছে সমুদ্রমুখী নদীটিকে। এ পাড়ার গাছেরা একটু অন্যরকম। বাঁধের গায়ে মাটি থেকে উঠে থাকা তাদের শ্বাসমূলগুলো আপনাকে নির্ভূল চিনিয়ে দেবে আপনি সুন্দরবনের কাছাকাছি কোথাও আছেন। আদিগন্ত জল আর আকাশ, আর দূরের দ্বীপরেখা, মাছ ধরার নৌকো, দূর দিয়ে চলে যাওয়া ট্রলার - মিলেমিশে এক ক্যানভাস ছবি। কাদামাটিতে নোঙর করে রাখা লঞ্চ। সারাই হয়ে জলে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় নৌকো। একটা ছোট্ট বাজার এলাকা। ভাতের হোটেল। বিকেলবেলা বাঁধের ওপরের রাস্তাটা বরাবর নদীর দিকে হাঁটলে চা-সিগারেট থেকে ফুচকা-আলুকাবলি-ঝালমুড়ি-আইসক্রিম।

মীন ধরার মরশুমে 'লাইভ' মাছ ধরা দেখা যায়। মাছ ভর্তি নৌকো সাঁতরে এসে পৌঁছয় ঘাটে। আমার গিন্নী এবং আরও কয়েকজন মৎস্য প্রেমিক বেড়ালের মত এগিয়ে যান। ঝুড়িতে কী কী মাছ উঠল। 


আগেও এসেছিলাম ডে ট্রিপে বার দুয়েক। বাইক রাইড করে। গাড়ি ড্রাইভ করে। এবারে ঠিক করেছিলাম এক রাত থাকব। শান্ত নির্জন কৈখালি'তে কোন হোটেল বা হোমস্টে নেই। রাত্রে থাকার একমাত্র জায়গা হল কৈখালি পর্যটক আবাস। ফোনে বুকিং হয় নিমপীঠ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম থেকে। ট্রেনে সাউথ শিয়ালদা থেকে এসে নামলাম জয়নগর -মজিলপুর। স্টেশনের বাইরে নিমপীঠ আশ্রমে যাওয়ার অটো পাওয়া গেল। দশ মিনিট পথের অটোভাড়া দশ টাকা মাথাপিছু । সকাল সকাল পৌঁছে গেছিলাম। আশ্রম কর্তৃপক্ষের সৌজন্য অনবদ্য । একটা গেস্ট রুম খুলে দিলেন ঘন্টা দুয়েকের জন্য। সেখানে স্নানটান সেরে ফ্রেশ হয়ে নেওয়া গেল। মহারাজ বললেন 'চারদিকটা ঘুরে দেখুন, দুপুরে ভোগ খেয়ে, যাবেন কৈখালি'। 

বেলা বারোটার মধ্যে আশ্রমে পৌঁছে দুপুরের ভোগের জন্য টিকিট কাটা যায়। শেষপাতে পায়েস সমেত পুরোদস্তুর লাঞ্চ'টির জন্য টিকিট মাথাপিছু দশ টাকা ন্যূনতম। নিমপীঠের শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সন্ন্যাসী স্বামী বুদ্ধানন্দজী মহারাজ। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন ভাবধারা অনুসারী, কিন্ত মিশনের অংশ নয়, এই সংস্থাটি, সুন্দরবনের এই অঞ্চলটির মানুষদের হাতে কলমে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার পাঠ দিয়ে যাচ্ছে গত পঞ্চাশ বছর যাবৎ । ঘুরে দেখলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেয়েদের স্কুল, হাসপাতাল, আশ্রমের নিজস্ব ফুল-ফল-সবজির খেত খামার, ল্যাবরেটরি। শ্রীরামকৃষ্ণ -সারদা- স্বামী বিবেকানন্দের সুসজ্জিত মন্দির চত্বরটি বেলুড় মঠের পরিবেশটির কথা মনে করায়। 

দুপুরে পংক্তিভোজন সেরে রওনা দেওয়া গেল কৈখালি। আশ্রম কর্তৃপক্ষই 'রিজার্ভড অটো' ঠিক করে দিয়েছিলেন। সাড়ে তিনশো টাকা আর গ্রামের রাস্তায় এক ঘন্টায় - নিমপীঠ থেকে কৈখালি। 


কৈখালি তে তখন বিকেল ফুরিয়ে শীতের সন্ধে নামছিল। ধূ ধূ জলরাশির ওপর নীল হয়ে অন্ধকার নামতে নামতে গোটা একটা দিনের আলো ফুরিয়ে আসাটুকু ধরে রাখার মত ক্যামেরার লেন্স আজও আবিষ্কার হয়নি। কোনওদিন হবেও না। তা'ও যেটুকুই পাওয়া যায় তাই'ই ধরে রাখতে চাওয়ার লোভ বড় চিরন্তন। মোবাইল ক্যামেরাটা বের করলাম। 

সন্ধের পর কিছু করার নেই এখানে। কিছু করার নেই - কথাটা যুগপৎ আক্ষরিক এবং আপেক্ষিক। হয় আপনি চূড়ান্ত বোর হবেন আর নয়তো এরকম একটা সন্ধেবেলা কাটানোর জন্যেই আবার আসতে চাইবেন এখানে। পর্যটক আবাসের ঘরে টিভি নেই। মোবাইলে নেট ভালো পাওয়া যায় না। সন্ধের পর অতএব যাকে বলে - 'থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার ..'। একা অথবা কয়েকজন - আড্ডা দেওয়ার, গান শোনার, বই পড়ার পক্ষে আইডিয়াল একটা সন্ধের নির্ভরযোগ্য ডেস্টিনেশন কৈখালি । পর্যটক আবাসের ঘরে এবং চৌহদ্দি'তে মদ্যপান নিষিদ্ধ।

শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম পরিচালিত পর্যটক আবাসটিতে কিন্ত শুধুই নিরামিষ নয়, মাছ-মাংস-ডিম সবই পাওয়া যায়। তবে মেনুকার্ড এর কোন ব্যাপার নেই। দু'বেলা ঘরোয়া ভাত রুটি ডাল সব্জি মাছ / মাংস/ডিম। সঙ্গে ব্রেকফাস্ট এবং বিকেলের টিফিন। খাবার খুবই ভাল। থাকা এবং খাবার মিলিয়ে মাথাপিছু ছ'শো টাকা প্রতিদিন। ঘরগুলি পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক সুবিধাযুক্ত। 


বিকেলের সূর্যাস্তর মতনই পরদিন ভোরে আদিগন্ত নদীর বুক থেকে সূর্য উঠতে দেখা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আকাশ আর জলের জমকালো রঙের খেলা জমে ওঠে শুধু সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময়ই। ঊষা আর গোধূলির দুই চিরকালীন ' লাইট শো ' দেখার জন্যেই আসা যায় কৈখালি পর্যটক আবাসে। ক্যামেরা সমেত। শীতের সকালে টাটকা খেজুর রস টেস্ট করে দেখাটা ইনসেনটিভ । 

মরশুমের রোববারগুলোর সকালে এসে সন্ধেয় ফিরে যাওয়া পিকনিক পার্টির ভীড়ে সরগরম থাকে কৈখালির এই নদীবাঁধ। বছরের অন্য সময়ে তেমন ভীড় নেই। চাইলে যাওয়া যায় বোট রাইডে। নৌকো বা লঞ্চে নদী পার হয়ে ঘুরে আসা যায় ঝড়খালি থেকে। ওখানে বন বিভাগের ব্যাঘ্র প্রকল্প'তে খাঁচার ওপারে রয়েল বেঙ্গল এবং কুমীর দেখে ক্যামেরার আশ মেটানো যেতে পারে। বারোটায় দুপুরের খাবার। একটায় চেক আউট। ফেরার জন্যে অটো ঠিক করে দিলেন পর্যটক আবাস কর্তৃপক্ষই। জয়নগর-মজিলপুর স্টেশন অবধি পৌঁছতে নেবে চারশো টাকা। শীতের সময় জয়নগর থেকে বহড়ু অবধি এ তল্লাটে পাওয়া যাবে বিখ্যাত 'জয়নগরের মোয়া'। ফিরতি লোকাল ট্রেনে এক ঘন্টার জার্নি রোববার বিকেলেই পৌঁছে দিল শহরে।

ফেব্রুয়ারী ২০২০



০৬ জুন ২০২২

কোয়েলের কাছে

 'কোয়েলের কাছে'!  এ ছাড়া ভাল ক্যাপশন এই ছবিটির হতেই পারে না। মারুমারের জঙ্গল পার হয়ে ছিপাদোহরের রাস্তায় কোয়েল নদীর এই ছবিটি তোলা।  সাধারণ মোবাইল ক্যামেরায়, 'আন এডিটেড' ছবি। তখন বিকেল হয়ে সন্ধে নামছিল। এই ছবিটিতে যা আমি ধরতে পারিনি, সেটা অনুভব করতে হলে আপনাকে বুদ্ধদেব গুহ একটুখানি পড়তেই হবে!

মার্চ' ২০১৮



০৫ জুন ২০২২

কোলাজ

"...শুনেছি, কোনো কোনো জেলার ফাঁসির আসামিকে নাকি গারদের দরজা সামান্য খুলে রেখে জেল থেকে পালাবার সুযোগ দেয় । আসামি ভাবে, জেলার বেখেয়ালে দরজা খুলে রেখে গিয়েছে। তারপর অনেক গা ঢাকা দিয়ে, একে এড়িয়ে, ওকে বাঁচিয়ে যখন সে জেলের বাইরে মুক্ত বাতাসে এসে ভাবে সে বেঁচে গেছে, ঠিক তখনই তাকে জাবড়ে ধরে দুই পাহারাওয়ালা— সঙ্গে জেলার তাকে চুমো খেয়ে বলে, ‘ভাই, জীবন কত দুঃখে ভরা । তার থেকে তুমি নিষ্কৃতি পাবে কাল ভোরে। আহাম্মুখের মতো সে নিষ্কৃতি থেকে এই হেয় নিষ্কৃতির চেষ্টা তুমি কেন করছিলে, সখা?’ পরদিন তার ফাঁসি হয়। আমার মনে হয়, ফাঁসির চেয়েও ওই যে জেলের বাইরে ধরা পড়া সেটা অনেক কঠোর, কঠিন, নির্মম।..."

জলে ডাঙায় / সৈয়দ মুজতবা আলী 

 ছবিটা'র শিল্পী সমীর মন্ডল। জলরঙে আঁকা ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছিল 'তারে জমিন পর' সিনেমাটিতে

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

এলোমেলো ভাবনা-১

আমার চারপাশে অন্ধকার। আর সামনে একটা মস্তবড় স্ক্রিন। সিনেমা দেখছি। পরপর ছবি সরে সরে যাচ্ছে। আমি দেখছি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস একটা গাড়ী করে বেরিয়ে গেলেন এলগিন রোডের বাড়ী ছেড়ে। শত শত ইহুদী দৌড়চ্ছে জার্মানি সীমান্তর দিকে। বাংলাদেশী শরণার্থীরা ছুটে যাচ্ছে একটা কাঁটাতারের বেড়ার দিকে। তসলিমা নাসরিন বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে বসে আছে এয়ারপোর্টে প্লেন ধরবে বলে। ইকুয়েডর দূতাবাসের বাইরে হাতে একটা সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ । ইরাক ছেড়ে কুয়েত সীমান্তের দিকে দৌড়চ্ছে অক্ষয়কুমার , সঙ্গে হিরোইন , সিরিয়া ছেড়ে বাবার কোলে চেপে যাচ্ছে আয়লান কুর্দি , লিবিয়া ছেড়ে শয়ে শয়ে লোক পড়ি কি মরি করে দৌড়চ্ছে। এরা সবাই পালাচ্ছে। আজন্মচেনা নিজের ঘর, নিজের বাড়ী, নিজের দেশ , চেনা মানুষজন ছেড়ে পালাচ্ছে । ওদের বলা হয়েছে নিজের জায়গা ছেড়ে চলে যাও। ওদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নিজের দেশ থেকে ।
ক্যামেরা  হঠাৎ জুম করে ধরল ভীড়ের মধ্যে একটা ছেলের ওপর। চিনতে পেরে চমকে উঠলাম । আমি জানি ওর বয়স উনিশ বছর। ওর পায়ের কাছে নতুন কেনা কালো ট্রাঙ্ক, কাঁধে একটা সবুজ রঙের সাইড ব্যাগ । ব্যাগের মধ্যে ভর্তি আরো উনিশটা বছর। 
উফ।। ভাগ্যিস মোবাইলটা ঠিক তখনি বেজে উঠল।
Lion King দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গের ছবিটা একটা স্ক্রিনশট। 





২৬ জানুয়ারি ২০১৯

শ্রীজাত

সিরিয়ালে দেখা ভালোবেসে মাখা প্রিয় সন্দেশ
পালটে যাচ্ছে পতাকার রং আমার স্বদেশ


এরকম করে কে লিখতে পারেন। একমাত্র শ্রীজাত। আমার মনে আছে একটা সময়ে সুবোধ সরকারের কবিতা নিয়ে খুব অবসেসড হয়ে ছিলাম। 'ছেলেটি এবং মেয়েটি' পড়ে তাক লেগে গেছিল। সেই সুবোধ সরকার এখন ধর্মতলার মোড়ে ক্যামেরাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিফ খাচ্ছেন । মনে করছেন এটা একটা আন্দোলন করা হল। গরুর বা শুয়োরের বা হাঁস-মুরগি বা অন্য যে কোনও পাখি বা জীব জন্তুর মাংস খাওয়া বা না খাওয়া নিয়ে এত চিৎকার চ্যাঁচামেচি করার কী আছে কে জানে !

শ্রীজাত একজন কবির মতই থাকেন অন্তরালে। তাঁর কলম ঝলসে ওঠে মাঝে মাঝে। শব্দগুলো চেতনায় ছাপ ফেলতে থাকে। বন্য শব্দগুলো ভাঙতে জানেন এই কবি।  ছন্দ আর লয় আর অন্তমিল দিয়ে গাঁথতেও জানেন শ্রীজাত। ইদানীং কবি থেকে গীতিকার হওয়ার রাস্তায় হেঁটে গেছেন তিনি। বাংলা গানের লি্রিক্যাল কোয়ালিটি বেড়েছে তাতে।

শ্রীজাতকে প্রথম দেখেছিলাম নন্দন চত্বরে। বছর কুড়ি আগে। তরুণ কবি-শিল্পীদের ওটাই আড্ডা মারার জায়গা কিনা। তখন কফিহাউসের দিন পড়ন্ত। সাউথ সিটির ফুডকোর্ট তখনও জন্মায়নি। নন্দন-অ্যাকাডেমি চত্বরের গাছগুলোতে অনেক পাখি ছিল। আর নন্দনের পেছন দিকটায় ছিল জলে ঘেরা ফোয়ারা। ওদিকটা একটু নিরিবিলি। প্রেমিক-প্রেমিকাদের সঙ্গে বসে দু'চারটে পার্সোনাল কথা বলার থাকলে ওদিকটায় গিয়ে বসা যেত।  অ্যাকাডেমিতে নিয়মিত নাটক, শিল্প প্রদর্শনী হয়। খুব খিদে পেয়ে গেলে পেছনের ক্যান্টিনটায় আলুর রোল খেয়ে নেওয়া যায়। আর ওখানটাতেই চা-সিগারেটের ধোঁয়ায় এদিক-সেদিক ভেসে বেড়াত রং-তুলি, নতুন লেখা কবিতার লাইন। এইরকম একটা সময়ে শ্রীজাতর সঙ্গে আমার প্রথমবার দেখা। বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল সে। তখনই ওর একটু আধটু নাম ছড়িয়েছে। ছন্দের ব্যবহার চমকপ্রদ। না, এগিয়ে গিয়ে আলাপ করার ব্যাপারটা ভেবে দেখিনি। অচেনা মানুষের সঙ্গে হঠাৎ গিয়ে আলাপ জমানো আমার স্বভাবে নেই, শুধু সেই কারণেই। কিন্ত 'ফ্যান' বনতে তো আর পারমিশন লাগে না। তাই তার পর অনেক দিন ধরে তার লেখা পড়ছি।  খুঁজেপেতেও। নন্দন চত্বরে আর যাওয়া হয় না। কিন্ত তাতে শ্রীজাতকে খুঁজে পেতে মোটেও অসুবিধে হয় না আমার।

ও হ্যাঁ, একদম শুরুতে লেখা লাইনদুটি শ্রীজাত'র নয়। আমার নিজেরই লেখা। লাইন দুটো মাথায় আসার পর লিখে মনে হয়েছিল কেমন যেন শ্রীজাত-শ্রীজাত মত হয়ে যাচ্ছে। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে এই প্যারাগ্রাফটাই লেখা হয়ে গেল।  

১২ জুলাই ২০১৬

মেঘ কুয়াশার দেশে

নভেম্বরের এক সকালে পৌঁছে গেলাম কালিম্পং। হাতে দিন পাঁচেকের ছুটি নিয়ে।  একটা দিন কালিম্পংয়ে ডেলো পাহাড় আর দুরপিন পাহাড় ঘুরে পরের দিনটা কোন দিকে যাব কিছু ঠিক ছিল না। চেনা দার্জিলিং চলে যাব না লাভা-লোলেগাঁও। পাহাড়ে বেড়াতে এসে সানরাইজ দেখতে যাবো না তাও কি হয়। আমাদের ড্রাইভার ছেলেটি পরামর্শ দিল সানরাইজ দেখতে হলে লোলেগাঁও যাওয়াই ভাল। বলল ওখানে একদিন থেকে তারপর লাভা চলে যেও। লোলেগাঁও থেকে এক ঘন্টাতেই পৌঁছে যাওয়া যায় লাভাআর লাভা থেকে শিলিগুড়ি ফেরার গাড়ি পেতেও সুবিধে হবে তোমাদের। পরের দিন সকালে রওনা দিলাম লোলেগাঁওয়ের দিকে। পঞ্চান্ন কিলোমিটার পাথুরে রাস্তাটা দিয়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাওয়া একটা অভিজ্ঞতা। একপাশে সোজা উঠে যাওয়া পাহাড়ের গায়ের নাম না জানা ফুল গাছপালা আর লতাপাতা অচেনা ঝোরা দেখতে দেখতে পাকদন্ডী বেয়ে নামতে নামতে এসে পৌঁছলাম রেলি নদীর শরীরে রিভার বেডে বছরের এই সময়টায় এখন জল নেই তেমনএকটা ঝরণার মত জলধারা সাদা পাথরগুলো ভিজিয়ে খেলতে খেলতে ছুটছে তিস্তার সঙ্গে গিয়ে মিশবে বলে। রিভার বেড পার হয়ে এবার অন্য একটা পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে ওঠার পালাএকটু ওপরেই মেঘ জমে আছে । হাত বাড়িয়ে ছোঁয়ার কোনো দরকার নেই। একটু বাদেই আমরা পৌঁছে যাব ওদের ভেতরে। চুলের কাঁটার মত বাঁক অজস্র। মোবাইলের গুগল ম্যাপে রাস্তাটা সাপলুডোর বোর্ডের মত দেখাচ্ছে।ম্যাপ দেখে আশপাশের জায়গাগুলোর নাম জানার চেষ্টা করি। সবুজ পাহাড়ের গায়ে গুঁজে দেওয়া যেন ছোট্ট ঘরবাড়ীগুলো অনেক দূর থেকে দেখা যায়। রাস্তার পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে পার হয়ে যায় এক একটা ছোট্ট গ্রাম। যত ছোট বাড়ীই হোক না কেন এক টুকরো ফুলের বাগান এদের সবার বাড়ীর সামনে।
পাইনের বন শুরু হল। পাহাড়ের ঢালে ঘেঁষাঘেঁষি করে সোজা দাঁড়িয়ে আছে  পাইন গাছের দলরোদ এসে পড়ছে পাহাড়ের ঢালে। গাছেদের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে দূরের পাহাড়ী গ্রামের ল্যান্ডস্কেপ। দূরে আকাশের নীচে ঘুমিয়ে আছেন বুদ্ধ। বরফে শরীর ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা। নানান শেডের নীল আর সবুজ রঙের খেলা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম প্রায় সাড়ে ছ’হাজার ফুট ওপরে পাইন গাছের বনে আর মেঘ দিয়ে ঘেরা  নির্জন ছোট্ট গ্রাম  লোলেগাঁও। স্থানীয় নাম কাফের। কলকাতায় যাদের দেখতে গেলে মাথা উঁচু করে আকাশে তাকাতে হয় এখানে ওরাই ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের। আজ মেঘলা দিন। ভিজে তুলোর মত মেঘ উঠে আসছে দক্ষিণ দিকের উপত্যকা থেকে। ঠান্ডা কনকনে হাওয়া। এমন হাওয়ায় অলস হাঁটতে ভালো লাগবে। হোটেলের ঘরে ব্যাগপত্তর রেখে বেরিয়ে পড়লাম। সাতটা কি আটটা বাড়ী। সবই প্রায় হোটেল। লাগোয়া ছোটো একটা দোকান। ক্যামেরার ব্যাটারি থেকে চটপটা মুখরোচক আচার, যার নাম তিতৌড়া,  ট্যুরিস্টদের জন্য ‘হঠাত করে ফুরিয়ে গেছে’ – মোটামুটি এমন সব কিছুই এখানে পাওয়া যাবে। পাশেই লোলেগাঁও মোটর স্ট্যান্ড। এখান থেকে গাড়ী পাওয়া যায় কালিম্পং, রিশপ, লাভা যাওয়ার জন্যে। সাইটসিয়িং করতে চাইলে গাড়ী পাওয়া যাবে এখানে থেকেই।

সন্ধে নেমে এলে মেঘ পাতলা হয়ে পাইন বনের ফাঁক দিয়ে চাঁদ বেরল। মায়াবী নরম আলোয়, দূরের পাহাড়ের গায়ে জোনাকির মত আলো জ্বলা কালিম্পং শহর দেখতে দেখতে রাত নেমে এল। কাল ভোরবেলা সূর্য ওঠা দেখতে যাব। সানরাইজ পয়েন্ট এখানে থেকে তিন কিলোমিটার । রাত থাকতে উঠে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে রওনা দিলাম। একটু একটু করে আকাশের রঙ পালটানো শুরু হল। দূরে টাইগার হিলের মিটিমিটি আলো, উল্টোদিকের পাহাড়ে কালিম্পং শহরে আর ভুটান পাহাড়ের মাথায় তখনও ঘুম না না ভাঙা নীলচে মেঘের দলের মধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে কমলা রঙের ছটা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে আকাশ পার করে গিয়ে পড়ল কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা মুকুটে। ডিমের কুসুমের মত সূর্য উঠে পড়ল জলপাইগুড়ির দিগন্তেতার  শুরু হয়ে গেল ঝকঝকে একটা দিন।

মোটর স্ট্যান্ড থেকে পায়ে হাঁটা দুরত্বেই ক্যানোপি ওয়াক। পাইন আর ফার্নের জঙ্গলে গাছের মধ্যে দিয়ে কাঠের পাটাতন আর মোটা তার দিয়ে বানানো ঝুলন্ত ব্রিজ। একসঙ্গে পাঁচজনের বেশী ওঠা নিষেধ। ব্রিজ পেরিয়ে পায়ে চলা পথ ধরে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাওয়া যেতে পারে মেঘ ছুঁয়ে থাকা সবুজ অরণ্যেফিরে আসার সময় মোটর স্ট্যান্ডের দোকানটায় বসে ঠান্ডা হাওয়া আর মেঘ মিশিয়ে এককাপ গরম কফির সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় একটা গোটা ছুটির দিন। 










কীভাবে যাবেন ঃ

কলকাতা থেকে কালিম্পং কীভাবে  পৌঁছতে হয় সেটা এখানে বিশদে না লিখলেও চলবে। আমার মতে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে একটা অটো ধরে পৌঁছে যান পানিট্যাঙ্কি মোড়ে। অটো ভাড়া গত বছর নভেম্বর মাস অবধিও ছিল কুড়ি টাকা মাথাপিছু। পানিট্যাঙ্কি মোড় থেকে পেয়ে যাবেন কালিম্পং যাবার শেয়ারের গাড়ি। টাটা সুমো বা মাহিন্দ্রা বোলেরো জাতের গাড়ি আপনাকে ঘন্টা তিনেকের মধ্যে কালিম্পং পৌঁছে দিতে নেবে সাড়ে তিনশো - চারশো টাকা

কালিম্পং ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে লোলেগাঁও যাবার গাড়ি আপনাকে রিজার্ভ করে নিতে হবে বারোশ থেকে পনেরশ টাকার মধ্যে।

ডেলো

কালিম্পং থেকে এক বেলায় ঘুরে আসতে পারেন ডেলো। পাহাড়ের ঊপরে বাংলো থেকে দেখতে পাবেন একশো আশি ডিগ্রি ভিউতে কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ সমেত এক আশ্চর্য ছবি। শেয়ার ট্যাক্সি পাবেন কালিম্পং ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকেই। সাইটসিয়িং ট্যুরে ঘুরে আসতে পারেন দূরপিন দাড়া, থোংসা গোম্ফা, গলফ কোর্স, ক্যাকটাসের বাগান

২৯ অক্টোবর ২০১৫

বাংলায় লেখা বা না লেখা

আনন্দবাজারে বেরনো লেখাটা কদিন ধরে আমাকে ভাবাল। বাংলায় লেখা  বা না লেখা নিয়ে। প্রায় বছর দুয়েক পরে আমার পরবর্তী পোস্ট।

আমি বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি নিজের মত করে কিছু লিখতে গেলে সেটা আমি বাংলাতেই লিখতে পারব। তার জন্যে বাংলা লিপি আর সেটা কম্পিউটারে টাইপ করার জন্যে একটা সহজ সরল সফট ওয়্যার চাই। আমি এর পেছনে কিছুটা পরিশ্রম করে ব্যাপারটা কিছুটা আয়ত্তে আনতে পেরেছি। কিন্তু বাংলা লিপিতে লেখা বক্তব্য আমার অবাঙালী আর বিদেশী বন্ধুদের কাছে পৌঁছবে না। তারা অনেকেই স্বচ্ছন্দে বাংলা বলতে পারে কিন্ত  পড়তে বা লিখতে পারে না।
তাই বাংলা লিপির বদলে বাংলা লেখা উচিত রোমান হরফে ।

রোমান হরফে বাংলা লেখার কোনও স্ট্যান্ডার্ড নিয়মকানুন নেই। আগেকার দিনে ভুল বানানে লেখা চিঠি পাওয়া যেত। বানান যেমনই হোক না কেন পেনের কালি আর হাতের লেখায় চিঠি লেখা মানুষটার একটা উত্তাপ পাওয়া যেত। সেটা স্পেশাল ছিল। এখন এস এম এস যুগ পার হয়ে হোয়াটস অ্যাপের যুগ চলছে।
এখন টাইপ করার সময় কম্পিউটার নিজেই আন্দাজ করে নেওয়ার চেষ্টা করে তুমি কোন শব্দটা লিখতে চাইছ। কাছাকাছি কয়েকটা শব্দ দেখিয়ে দেয়। তুমি ঠিক বানানের শব্দটা বেছে নিয়ে বসিয়ে দাও। বানান ভুলের সম্ভাবনা কমেছে। ঘরে ঘরে স্মার্ট বাচ্চাদের মত আজকাল হাতে হাতে স্মার্টফোন। লেখার মুডের ভেতর ফোনের এই নাক গলানো আমার পছন্দ নয়।
লেখার পর ভাষা শুধু লিপিতেই থাকে না। সেটা বদলে যায় ধ্বনিতে। আমরা জোরে জোরে অথবা মনে মনে পড়ি। পড়তে গেলে ধ্বনি আসে। ধ্বনির সঙ্গে আসে উচ্চারণ। ইংরেজি ভাষায় লিপির সঙ্গে উচ্চারণের বন্ধুত্ব বেশী । সেখানে  bi মানে বি bo মানে বো কিন্তু বাংলা হল ধ্বনি নির্ভর ভাষা। আমার একজন অবাঙালী বন্ধু বলেছিল 'বাঙ্গালী লোগ সব কুছ ও ও করকে বোলতা হ্যায়'। খাবো, যাবো, কোরবো, লোড়বো, জিতবো।  কিন্ত রোমান হরফে শব্দের পেছনে o বসানো সম্ভব নয়। তাই রোমান হরফে লিখতে গেলে এক একটা বাংলা শব্দের করূণ দশা হয় ।  ki hoyacha . পড়ে বুঝে নিতে হবে বলা হচ্ছে 'কি হয়েছে'।
আর আছে ইমোজি। ইমোশন বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে এগুলো ব্যবহার হয়। অনেকখানি টাইপিং তাতে বেঁচে যায়। লিখে লিখে কথোপকথনের সময় এটা একটা জরুরী ব্যপার। বাংলা সাহিত্য এখনো লিপি নির্ভর। সাহিত্যে ইমোজি ব্যবহার করা যায় না।  সাহিত্যের বাংলা লিপিকে জড়িয়ে ধরে আছে । ক্লাসিকাল গানের মত। ব্যবহারিক বাংলাটা আবার রোমান হরফের সঙ্গে বেশী স্বচ্ছন্দ বোধ করে।তাই তুমি কি লিখবে আর কারা সেই লেখা পড়বে সে ব্যপারে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। মানে টার্গেট অডিয়েন্স ঠিক করে নেওয়া প্রয়োজনীয়।

আলঙ্কারিক বা অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব্যাবহার করলে মাঝে মাঝে ব্যাপারটা কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন sharadiya priti shubheccha o abhinandan। তাছাড়া আমরা দৈনন্দিন জীবনে বেশ কিছু ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করি যার কোনো লাগসই বাংলা হয় না। tensn nio na, ..love u ..late hobe ..

আমি নিজেই এই লেখাটায় বেশ কিছু ইংরেজী শব্দ বাংলা লিপিতে ব্যবহার করলাম। সেটা রোমান হরফে লিখলে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। এসব নিয়ে আমি এখনও ভেবে যাচ্ছি।

২২ অক্টোবর ২০১৩

আরও কয়েকটা এলোমেলো কথা


কী যে এত খোঁজো
হাতের কাছে একটা জানলা পেলেই হল
অমনি খুলে দেখতেই হবে তার কী মানে
যতসব অন্ধকার তোমায় টানে




হারিয়ে ফেলে ফের খুঁজে পেলে তোমার প্রিয় ঝর্ণা কলম
সমস্ত দিন একলা থাকার নেশায় পাওয়া নিশির মত
চক্রাকারে মাথার উপর চিল-শকুনে মেলছে ডানা
রোদের গন্ধ বুকের ভেতর আরও একটা দিন চলে যায়




লাল ইঁটের দেওয়াল। পুরনো সাইকেল স্ট্যান্ড। সাদা চুনকাম করা ক্লাসরুম। বাঁদিক থেকে তিনটে ঘর ল্যাব। ধুলো পাক খেয়ে খেয়ে ওঠা গোড়ালি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অশ্বত্থগাছ-
আরে বাঃ - ফেসবুকে ছবিটা দেখে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে গেল।
কী মজার দিন ছিল সে'সব, বল?



আজ রোদ ঝলমলে একটা দিন। অন্য আর পাঁচটা দিনের মত সোঁদা গন্ধ বেরনো জল-কাদা মাখা নয়। আজ আপন মনে ডিউটি যাওয়ার নেই। আজ একদম নয় গরম খিচুড়ি-ডিমভাজা দিন।
আজ রোদ্দুর। আজ ভালো কিছু একটা হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা আঁচড়ে নিও।

এখন ব্যস্ততার দিন। নিয়ম করে যাই আর ফিরি। এটাই আমি সব সময় চেয়ে এসেছি। 

২০ অক্টোবর ২০১৩

সাদা কাক


বাজি একটা আশ্চর্য কর্ম। অথর্ব বেদ-এ নাকি 'বাজীকরণ' নামে একটা চ্যাপ্টার আছে, যেখানে যৌবনকে 'যেতে নাহি দিব'-র সুপ্ত ক্রিয়া কারসাজি নিয়ে আলোচনা আছে। যারা বিশেষ কোনো কর্মে পটু, সেই কর্মবাচক বিশেষ্যর সঙ্গে 'বাজ' যুক্ত করে তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পটুত্ব বোঝানো হয়। যথা-গুলবাজ, রকবাজ, আলুবাজ, বক্তৃতাবাজ ইত্যাদি। আজকের সাদা কাক একজন বাজিবাজ। তার কর্মকান্ড শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছু দিন আগে থেকেই। দোকান থেকে মাটি নিয়ে এসেছেন দু-তিন কিলো, ধোঁকা, করলাপটাশ ইত্যাদি নিয়ে এসেছেন। ওই বাজিবাজের আসল নামটা পালটে বরং অন্য একটা নাম দিচ্ছি - আনন্দময়। ওঁর কাছেই অবশ্য এই সব সাংকেতিক নামগুলো শেখা। যেমন, গন্ধক-কে বলতে হয় মাটি। গন্ধক বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার হয় বলে সম্ভবত বিক্রয় ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ আছে। পটাশিয়াম ক্লোরেট -কে বলা হয় করলাপটাশ। কলেরাপটাশ নামেও বিখ্যাত। আনন্দময়বাবু বাজির মশলার দোকানে গিয়ে পোড়া কাঠ হাতে নিয়ে বলেন -এটা 'কুল' বলছেন? বললেই হলো? আম। ওঁর ওস্তাদ-চোখ কাঠের পোড়া শরীরেরও ডিএনএ টেস্ট করতে পারে, কাঠের কুল-গোত্র বুঝতে পারে। বাজি বানাতে গেলে কুল কাঠের কয়লা নাকি ভাল। তবে সবচেয়ে ভালো নাকি বেগুন কাঠ।
তুবড়ি যদি ইলেকট্রিক করতে হয়, তবে অ্যালুমিনিয়াম চুর দিতে হয়। ভাল জাতের অ্যালুমিনিয়াম চুর পেতে গেলে দোকানে 'ধোঁকা' বলতে হয়। দোকানদার ওর সহকারীকে বলবে - আলুধোঁকা বার কর তো....। আলুধোঁকা হলো ধোঁকাকৃতি অ্যালুমিনিয়ামের ভঙ্গুর খন্ড। হামানদিস্তায় ভালো করে গুঁড়ো করে নিতে হয়।
আমাকে আনন্দময়বাবুই এই সব ধোঁকাজ্ঞান দিয়েছেন। উনি তুবড়ির সঙ্গে রংমশালও সৃষ্টি করেন। রংমশালে একটা সবুজ আভা বের হয়। উনি পিসি-র গুঁড়ো মেশান। পিসি হলো পি ভি সি-র গুঁড়ো।পাড়ার রঙের দোকানে 'গোপাল বার্নিশ' চাইলে আপনাকে যে বার্নিশটা দেবে, তা হলো কেপল বার্নিশ. কেপল যে-ভাবে গোপাল হয়ে যায়, সে ভাবেই পি ভি সি পিসি হয়ে যায়। পি ভি সি হলো এক ধরনের প্লাস্টিক। একটু লাল বিচ্ছুরণের জন্য চাই স্টোনের গুঁড়ো। স্টোন মানে স্ট্রনসিয়াম অক্সাইড। আমাদের আনন্দময়বাবু এ সব মশলা কিনে এনে কয়েক দিন রোদ্দুর খাওয়ান, তার পর হামানদিস্তায় গুঁড়ো করেন, তার পর আবার রোদ্দুর। 
আনন্দময়কে দেখতাম মাঝেমধ্যে ফোনে করতে। ফোনে কারোর সঙ্গে কিছু সংখ্যা বলাবলি করতেন। যেমন - ২-১০-১-৬ নাকি ৩-৯-২-৮? উনি শেয়ার বা ফাটকার পথ মাড়ান না। এগুলো হলো তুবড়ির ফর্মুলা। কাঠ কয়লা-সোরা-গন্ধক-লোহাচুরের ভাগ। কিছু তুবড়ি উনি ইলেকট্রিক করবেন, কিছু রংমশালে স্টোন দেবেন। তার পর বাহারি খোলে ভরবেন, রঙিন কাগজে মুড়বেন, তার পর?
তার পর আনন্দময়বাবু ডায়রিটা বের করবেন। ওখানে অনেক ঠিকানা লেখা। প্রতি বছর নতুন ঠিকানা যোগ হয়। ব্যাগে রংমশাল আর তুবড়িগুলো পুরে লোকের বাড়ি বাড়ি যাবেন, অনাথ আশ্রমে যাবেন। পুলের তলায় ভিখিরিদের কাছেও।
বিক্রি করতে নয়, বিলি করতে। ওঁর বন্ধু রতনের দুই ছেলে। ওদের জন্য চারটে তুবড়ি, আটটা রংমশাল। বিশুর তো একটাই মেয়ে, ওর জন্য কিছু কম। এ রকম সুধীর, অলোক, সমীরণ ইত্যাদিরা আছে. এঁদের ছেলেমেয়েরা ক্রমশ বড় হয়ে যায়, রংমশাল জ্বালায় না আর। আনন্দময় বলেন-তোমাদের ভাগ্নে-ভাগ্নি নেই? ভাইপো-ভাইঝি?
কার বাড়িতে নতুন বাচ্চা হল সেই সংবাদ রাখেন হিজড়েরা আর আনন্দময়বাবু। শিশুর বয়স পাঁচ হলে হাতেখড়ি, ছয় হলে হাতে রংমশাল। পাড়ার মুদি দোকানিটি বিয়ে করেছে। আনন্দময়ের পুলক জাগে। আমায় বলেন, আপনার পুত্রটি তো বিয়ের যুগ্যি হলো, বিয়েটিয়ে করবে কবে? বলি- বিয়ে করবে, ওর সন্তান রংমশাল ধারণ-যুগ্যি হবে, ততদিন আপনি রংমশাল বানাবার যুগ্যি থাকবেন তো? আনন্দময় হাসেন. বলেন, থাকতেই হবে। যেন থাকি। বাজীকরণ তো করছি।

আনন্দর নিজের সন্তান নেই, নিজের নাতিপুতিদের হাতে আলোর নাচন দেখার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাচ্চাদের মুখে একটু হাসির ছটা দেখবার জন্যই ওঁর এই এক মাসের বাজীকরণ প্রক্রিয়া। উনি বলেন, সবার হাতের আলো হয়তো দেখতে পাই না, কিন্তু আলো নাচে - আমার প্রাণের কাছে।আলোর ঢেউয়ে মল্লিকা, মালতীরা, মন্টু-সন্টুরা মেতে ওঠে, মাইরি, কী ভাল লাগে!
এই প্রতিবেদনটা লেখার দু'দিন আগে ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। দেখলাম,বিমর্ষ। বললেন, বাড়ির কাজের মেয়েটা লাইগেশন করিয়ে এসেছে। ওর দুটো মোটে বাচ্চা। খুব মন খারাপ। সবাই যদি আমার সঙ্গে এ ভাবে বিট্রে করে, আমি কী নিয়ে বাঁচব?




স্বপ্নময় চক্রবর্তী
২০শে অক্টোবর ২০১৩ 'রবিবাসরীয়' আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত

১০ অক্টোবর ২০১৩

মন খারাপের চেয়ার


ক্লাসের সব ডেস্কের থেকে দূরে,  আলাদা করে রাখা একটা ডেস্ক। এমন জায়গায়, যেখানে বসলে ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ারই সুযোগ নেই, কথা বলার সুযোগ দূরস্থান. স্কুলের প্রিন্সিপাল ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন সেই ক্লাসঘর। জানতে চাইলাম , নিশ্চয় খুব দুষ্টু ছেলেদের জন্য এই ব্যবস্থা? মধ্য চল্লিশের ভদ্রমহিলা হাসলেন। বললেন, এই স্কুলের সবাই তো দুষ্টু ছেলে। এই চেয়ারটা তাদের জন্য, যাদের বাড়িতে আজ কোনো একটা অশান্তি হয়েছে। সেই অশান্তির জন্য তার মন খারাপ। স্কুলে এসে এই চেয়ারে বসে পড়লেই অন্যরা বুঝতে পারে, তার আজ মন খারাপ। টিচাররাও বুঝতে পারেন। যে এই চেয়ারে এসে বসে, তাকে সবাই সেদিনের জন্য ছেড়ে দেয়। তার সঙ্গে কেউ ঝগড়া করে না, পড়া ধরে না।

মন খারাপের চেয়ার। সিঙ্গাপুরের নর্থ লাইট স্কুলে প্রথম পরিচয় হলো এই চেয়ারটার সঙ্গেই। এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা ১৪ জন সাংবাদিক সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম, সেখানকার এক সরকারী সংস্থার দেওয়া এশিয়া জার্নালিজম ফেলোশিপে। আয়োজকরা গোটা দেশ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন আমাদের। দেশ মানে শুধু শহরটাই। ওইটুকুই দেশ। বছর ষাটেক আগেও শান্ত, অলস একটা মফসসল ছিল সিঙ্গাপুর, জেলেদের বসতি। স্বাধীনতার পর হঠাৎই ঘুম ভেঙ্গে উঠলো যেন- চড়চড় করে উন্নতি, ভোল বদলে শহরটা হয়ে উঠলো দুনিয়ার আধুনিকতম শহরগুলোর একটা। এখন গোটা দুনিয়ার ব্যাঙ্কের সদর দফতর এই শহরে, এখানকার চাঙ্গি এয়ারপোর্ট বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরের তালিকায় পড়ে। আর ,এই মহাকাশযানের গতিতে উন্নতি করতে গেলে একটা শর্ত অপরিহার্য - এই শহরে শুধু সফলদেরই দাম। সে দাম অনেক, কিন্তু শুধু তাদের জন্য , যারা বাকিদের হারিয়ে দৌড়ে এক নম্বর হতে পারে। যারা সে দৌড়ে হেরে যায়, তারা হেরেই যায়। সেই হেরোদের কী হলো, তা নিয়ে ভাবার সময় এই শহরের নেই। মনও কি আছে?
সেই দেশের একটা স্কুলে মন খারাপের চেয়ার? প্রথমে অবাক লাগে। তার পর এই স্কুলের গল্প শুনি। এই স্কুলটা হেরোদেরই স্কুল। এই নর্থ লাইট স্কুলে ভর্তি হবার একটাই শর্ত- অন্য কোনো স্কুলে দু’বার ফেল করতেই হবে! আর, সেই স্কুলের প্রিন্সিপালের থেকে লিখিয়ে আনতে হবে, এই ছেলেটার, বা মেয়েটার কিছু হবার কোনো আশা নেই। ব্যস, এই অবস্থায় পৌছতে পারলেই হল- নর্থ লাইট স্কুলের দরজা খোলা।
 সেই খোলা দরজা দিয়ে কারা ঢুকে পড়ে এই স্কুলের মধ্যে? তারাই, যাদের প্রায়ই মন খারাপ করে স্কুলে আসতে হয়। মন খারাপের কারণ অনেক। হয়তো বাবা নেশার তাড়নায় স্কুলের মাইনে খরচ করে ফেলেছে, অথবা মা আর বাবার মধ্যে তুমুল মারপিট হয়েছে কাল রাতে, অথবা দাদাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছে ড্রাগ অ্যাবিউজের অভিযোগে। এই ছেলেমেয়েগুলো সিঙ্গাপুরের হেরে যাওয়া দুনিয়ার সন্তান। এদের মা-বাবা কেউ কোনও দৌড়ে জিততে পারেনি। তাই তারা এক কামরার ফ্ল্যাটে পাঁচ জন গাদাগাদি করে থাকে। সেই ঘরেই মারপিট দেখে, ঝগড়া দেখে, হয়তো কখনও কখনও ঘুমের ভান করে চোখের কোণ দিয়ে আদরও দেখে। যে দিন রাতের খাবার কেনার পয়সা থাকে না, সে দিন শুধু জল খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। তাই সকালে উঠে এদের মন খারাপ হয়। স্বাভাবিক। যে দিন সেই মন খারাপের খুব বাড়াবাড়ি হয়, সে দিন ক্লাসঘরে আলাদা করে রাখা চেয়ারে এসে বসে পড়ে তারা. সে দিন তার সঙ্গে কেউ ঝগড়া করে না, কেউ পড়া ধরে না।

সিঙ্গাপুর দেশটা আশ্চর্য। সেখানে প্রতি রাস্তায়, প্রতি মোড়ে, প্রত্যেক অফিসে-স্কুলে-মেট্রো স্টেশনে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো। সারাক্ষণ প্রশাসনের  চোখ নজর রাখে সবার ওপর। সামান্যতম বেচালও ধরা পড়তে বাধ্য। আর তার শাস্তিও মারাত্মক। আমরা তখন সিঙ্গাপুরেই- এক দিন কাগজে পড়লাম , সরকারি সম্পত্তির ওপর রং লেপে দেওয়ার শাস্তি হয়েছে এক জনের। পনেরো ঘা চাবুক! আঁতকে উঠবেন না। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি দেশে চাবুক বা বেত্রাঘাত বেশ প্রচলিত শাস্তি। আর এই শাস্তির আদেশ দেয় আদালতই।
নর্থ লাইট স্কুলেও ক্যামেরা বসানো আছে। প্রত্যেক ক্লাসঘরে, প্রতিটি সিঁড়িতে. সেই ক্যামেরা রেকর্ড করে চলেছে ছাত্রদের সব চালচলন। কিন্তু, এই স্কুলের নিয়ম আলাদা। এখানে ছাত্রদের খারাপ আচরণগুলোকে পাত্তা দেওয়া হয় না। বেছে নেওয়া হয় শুধু ভাল আচরণগুলো। আর তার জন্য পুরস্কারেরও ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি ক্যামেরার তলায় টাঙানো বোর্ডে লেখা আছে   ' এই ক্যামেরায় তোমাদের সব ভাল জিনিস রেকর্ড হয়ে থাকছে'। যে ছেলেমেয়েগুলো বাড়িতে শুধু অভাব দেখে, হিংস্রতা দেখে, ঝগড়া দেখে - তারা এই ক্যামেরার সামনে এসে কেমন করে যেন বদলে যেতে থাকে। স্কুলে ভর্তি হবার পরেই যে ছেলেটা রেগে গিয়ে কাচের জানালা ভেঙে দিয়েছিল, সেই  ছেলেটাই নিজের রুমাল বার করে মুছে দেয় দেওয়ালে লেগে থাকা দাগ। খারাপ আচরণের জন্য শাস্তি হয় না, অথচ ভাল আচরণের জন্য সবার সামনে প্রশংসা পাওয়া যায়- এই বোধটা যখন মনে বসে যায়, তখনই ভিতর থেকে বদলে যেতে থাকে তারা। এক জন নয়, সবাই। সব্বাই। তার পর ক্যামেরা থাক আর না-ই থাক, সেই ভাল আচরণগুলো সঙ্গে থেকে যায়। হয়তো আজীবন থাকবেও।
      স্কুলের প্রিন্সিপাল একটা গল্প বলছিলেন। তাঁর ছেলের গল্প। তখন ছেলের বয়েস তেরো। সে পড়াশোনায় ভাল, শহরের নামী স্কুলে পড়ে। সচ্ছল পরিবারের এই বয়সের ছেলেরা যেমন হয়,
সে-ও একেবারেই সে রকম। মায়ের স্কুলের কোনোও একটা বিশেষ দিনে মায়ের সঙ্গে এসেছিল সে, দেখবে বলে। স্কুলের অনুষ্ঠান উপলক্ষে স্থানীয় এক বেকারী কিছু উপহার পাঠিয়েছিল। সামান্য উপহার - কাপ কেক। ছাত্রছাত্রীদের জন্য। একটা টেবিলের ওপর কয়েকটা রেকাবিতে রাখা ছিল সেই কেকগুলো। ছেলেমেয়েরা লাইন করে এসে সেই রেকাবি থেকে কেক তুলে নিচ্ছিল, প্রত্যেকে একটা করে। প্রিন্সিপালের ছেলে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই, কিন্তু সে মোটেই ভালবাসে না ওই সাধারণ কেক। ফলে, সে নেয়নি। সে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এমন সময় তারই বয়সী একটা ছেলে এগিয়ে গেল প্রিন্সিপালের দিকে। জিজ্ঞেস করল, সে কি একটার বদলে দুটো কেক নিতে পারে? প্রিন্সিপাল জিজ্ঞেস করলেন,  কেন? ছেলেটি বলল, তার দাদা এই কেক খেতে  খুব ভালবাসে। সে দাদার জন্য একটা কেক নিয়ে যেতে চায়। প্রিন্সিপাল বললেন, সবার নেওয়া হয়ে গেলে যদি অবশিষ্ট থাকে, তবে সে অবশ্যই নিতে পারে। ছেলেটি শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। সবার নেওয়া হয়ে গেলে সে আর একটা কেক তুলে যত্ন করে ব্যাগে ভরে রাখল। একটাই। অনেকগুলো পড়ে ছিল যদিও।
প্রিন্সিপালের ছেলে বাড়ি যাওয়ার পথে পুরো রাস্তা কেঁদেছিল। তার পর সে আর কোনও দিন কোনোও খাবার খেতে আপত্তি করেনি।

আমরা স্কুল দেখতে থাকি। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যাই একটা ঘরে- খেলার ঘর। সেখানে মস্ত বিলিয়ার্ড বোর্ড , টেবিল টেনিস বোর্ড। দারুণ। আমাদের পোড়া কলকাতায় তো প্রশ্নই নেই, সিঙ্গাপুরেও খুব বেশি স্কুলে অমন বোর্ড আছে বলে মনে হলো না। সবই ছাত্রছাত্রীদের খেলার জন্য। তবে সব ছাত্রছাত্রীর জন্য নয়। যাদের কাছে পয়েন্ট আছে, শুধু তারাই খেলতে পারে সেই পয়েন্ট পাওয়া যায় ভাল হয়ে থাকলে। ভাল আচরণ ক্যামেরায় রেকর্ড হলেও পয়েন্ট, টিচাররা প্রশংসা করলেও পয়েন্ট। সেই পয়েন্টের টোকেন পাওয়া যায়। পয়েন্ট জমিয়ে জমিয়ে একটা বোর্ড খেলার মত অবস্থায় এলেই খেলতে চলে আসে ছেলেমেয়েরা। আসল গল্প অবশ্য সেটা নয়। এই ঘরে কোনো নজরদার নেই, কোনো ক্যামেরাও নেই। যথেষ্ট পয়েন্ট না থাকলেও খেলতেই পারে কেউ, যদি তার ইচ্ছে করে। কিন্তু, কেউ খেলে না। সবাই পয়েন্ট জমা পর্যন্ত অপক্ষা করে। অবাক হলাম। তার পর মনে হলো, বিশ্বাসের এই এক গুণ। যদি কাউকে সত্যিই বিশ্বাস করা হয়, সে প্রাণপণ চেষ্টা করে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে। আর, এই ছেলেমেয়েগুলো যে পরিবেশ থেকে আসে, যে পরিবার থেকে আসে, সেখানে একে অপরকে অবিশ্বাস করাই দস্তুর। সেখান থেকে এসে হয়তো প্রথমে এই বিশ্বাসের আলোহাওয়া অলীক লাগে, তার পর তারা নিজেরাই বুঝতে পারে, না চাইতেই কি দুর্মূল্য সম্পদ তাদের কাছে এসেছে। তাকে প্রাণপণ রক্ষা করার কথা তখন তাদের বলে দিতে হয় না।

আমরা স্কুলের বাগান দেখতে যাই. এই বাগানের একটা গল্প আছে। স্কুলের পিছনে খানিকটা জমি পড়ে ছিল। এমনিই। এক দিন ছাত্রছাত্রীরা এসে প্রিন্সিপালকে বলে, তারা সেই জমিতে গাছ লাগাতে চায়। প্রিন্সিপাল এক কথায় নাকচ করে দেন এই আবদার। পাগল নাকি! স্কুলের পিছনে শেষে আগাছার জঙ্গল হবে! ছেলেমেয়েরা হাল ছাড়ে না। তারা ঘুরেফিরে একই দাবি জানাতে থাকে. তারা যেখানে থাকে, সেখানে এক ফোঁটাও জমি নেই. একচিলতে বারান্দাতেও সংসারের জিনিস ঠাসা.তারা গাছ লাগবে কোথায়? শেষ পর্যন্ত প্রিন্সিপাল রাজি হন. একটাই শর্ত, মাঝপথে বাগানের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে চলবে না. ছেলেমেয়েরা প্রবল উত্সাহে ঝাঁপিয়ে পড়ে. সেই জমিতে একটা একটা চারা ক্রমে বড় হয়ে উঠতে থাকে. কুমড়ো, পেঁপে,সা থেকে ফুলকপি- সবই ফলে সেই বাগানে. সেই ফসল বিক্রি হয়, সেই টাকা স্কুলের তহবিলেই দিয়ে দেয় ছেলেমেয়েরা. স্কুল শেষ হওয়ার পরেও তারা বাড়ি যেতে চায় না. বাগানে নিজেদের গাছের কাছে যায়. তার কতটা বাগানের টানে, আর কতটা বাড়ি ফেরার সময়টাকে যত দূর সম্ভব পিছিয়ে দেবার জন্য, কে জানে! তারা তো দুই পৃথিবীর বাসিন্দা. স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই আবার সেই ঝগড়াঝাটি , অশান্তি দুনিয়া - ছোটরাও তো পালানোর পথ খোঁজে।

ছেলেমেয়েদের গল্প বলেন প্রিন্সিপাল, আর আমরা দেখতে পাই, তাঁর চোখে ক্রমশ জমে উঠছে মায়া। এই ছেলেমেয়েগুলোর জন্য মায়া। যারা নিজেদের বাড়ির পরিবারের না-পাওয়াগুলোকে খানিকক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখতে স্কুলে আসে প্রতি দিন। শরীর খারাপ নিয়েও আসে। তারা স্কুল কামাই করতে চায় না পারতপক্ষে। কি পায় তারা এই স্কুলে? শুধু একটা খেলার ঘর, একটা বাগান? পড়াশোনায় ভুলের জন্য তেমন কঠিন শাস্তি না পাবার আশ্বাস? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? একটা মমতার আস্তরণ, তাদের না-পাওয়া, তাদের সংকটগুলোকে বুঝতে পারার মতো কয়েকজন শিক্ষক? তাদের হেরো বলে দেগে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি? হেরে যাওয়া লড়াই জিততে সব রকমের সাহায্যের বাড়িয়ে দেওয়া হাত? জিজ্ঞেস করে ফেলি। প্রিন্সিপাল বলেন, এই ছেলেমেয়েগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি কি জানেন? তাদের এই বিশ্বাসটুকু দেওয়া যে তারা অন্য কারও চেয়ে একটুও কম যায় না। তারা কোনো লড়াই এখনও হেরে যায়নি। সবাই তো লেখাপড়ায় ভাল হয় না. আর, এই স্কুলে আসার জন্য পর পর দু'বার ফেল করতেই হয়! কাজেই, এখানে যারা আসে,তারা কেউই পড়াশোনায় ভালো না। আমরা তাই পড়াশোনাতেই সব জোর দিই না। এখানে হাতের কাজ শেখাই। কেউ ইলেকট্রিশিয়ান হবার কোর্সে ভর্তি হয়, কেউ হোটেল ম্যানেজমেন্ট শেখে, কেউ বিউটিশিয়ান কোর্স করে। তারা শিখেও ফেলে চটপট। নিজেরাও অবাক হয়। আর,সবচেয়ে বেশি যেটা হয়, ওদের মধ্যে নিজের প্রতি বিশ্বাস তৈরী হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে যে দুনিয়াটা ওদের ঘাড়ে চেপে বসেছে, তার থেকে যে বেরিয়ে আসা সম্ভব- ওরা বুঝতে পারে। আমাদের কাজ, এই বিশ্বাসটুকু তৈরী করে দেওয়া।
কথা বলতে বলতেই চোখে পড়ে, স্কুলের দেওয়াল জুড়ে মস্ত এক পোস্টার- অন্ধকার আকাশ, আর তাতে ঝলমল করছে কয়েকটা তারা। নিচে লেখা, অন্ধকার যত গাঢ় হবে, তুমি ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সত্যিই তো, নর্থ লাইট মানে ধ্রুবতারা। অন্ধকার আকাশে যে এল নাবিকদের কখনো পথ হারাতে দেয়নি। এই ছেলেমেয়েগুলো নিজেদের পথ খুঁজে নেয়। বিশ্বাসের পথ। স্কুলের নিয়ম, কোনো ছাত্র সিগারেট খেতে পারবে না। স্কুলের ভিতরে তো নয়ই, বাইরেও নয়। এক দিন স্কুলের কয়েকটি ছাত্র, স্কুল থেকে অনেক দুরে একটা পার্কে দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। স্কুলের এক শিক্ষিকার এক আত্মীয়ের চোখে পড়ে তারা। তিনি স্কুলের ইউনিফর্ম চিনতেন। তিনি সেই ছেলেগুলিকে কিছু বলেননি, কিন্তু তার পরিচিত সেই শিক্ষিকাকে কথাটি জানান। পরের দিন স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে সেই শিক্ষিকা শুধু বলেন, তোমাদের মধ্যে কয়েকজন কাল লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছিলে। কারা, আমি জানি না। জানতেও চাই না। কিন্তু, তারা স্কুলের বিশ্বাস নষ্ট করেছ। তাঁর কথা শেষ হবার পর মিনিট খানেকের স্তব্ধতা। তার পর এগিয়ে এলো ছেলেগুলি। স্বীকার করে নিল নিজেদের দোষ। সবার সামনে। এই ছেলেগুলোকে আমি চিনি না, কিন্তু নিশ্চিত জানি, এরা কোনোও দিন বিশ্বাসের পথ থেকে সরে আসবে না।

আমাদের স্কুলের অডিটোরিয়ামে নিয়ে যান প্রিন্সিপাল। সেখানে একটা ফিল্ম দেখানো হবে। স্কুলের অ্যানুয়াল ডে-র ছবি। অ্যানুয়াল ডে-তে এখানে অনেক তাঁবু খাটানো হয়। প্রত্যেক ছাত্রের জন্য একটা করে তাঁবু। তাদের বাবা-মা এসে থাকেন তাদের সঙ্গে. টানা দু'দিন। ছেলেমেয়েদের বন্ধুদের দেখেন, তাদের স্কুলের জীবন দেখেন। ফিল্ম চলে, আমরা দেখতে থাকি। একটা বছর বারোর মেয়ে স্টেজে উঠে গান গায়। তার বাবা-মা অবাক হয়ে দেখেন। তার পর স্কুলের এক শিক্ষিকা সেই মেয়েটির সব ভাল দিকগুলোর কথা বলেন, তার সমস্ত সাফল্যের কথা বলেন। সেই মেয়েটি নেমে যায়। তারই বয়সী একটি ছেলে স্টেজে ওঠে। সে-ও তার মা-বাবাকে অবাক করে দারুণ সিন্থেসাইজার বাজায়। তার পর তার সম্বন্ধেও বলতে থাকেন এক শিক্ষিকা।
এ ভাবেই চলতে থাকে। তার পর হঠাৎ অন্য দিকে ঘুরে যায় ক্যামেরা। প্রথম যে মেয়েটা স্টেজে উঠেছিল, তাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছেন তার বাবা-মা। মেয়ে বাবার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কান্না থামলে বাবা বললেন, আমার মেয়ে যে এত ভাল, এত কিছু পারে, আমি জানতামই না। ওকে তো সময় দিইনি কখনো। শুধু কষ্টই দিয়েছি। আজ থেকে আর না। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে খুব ভাল ভাবে বাঁচব।


ফিল্ম শেষ হয়। আমরাও ফিরে আসি। স্কুলের গেট পেরোতে পেরোতে মনে হয়, অনেকগুলো মানুষের জীবন পাল্টে দেওয়ার একটা চেষ্টা কি আমরাও করতে পারিনা? কখনও?